আমাদের Child Psychology কোর্স আছে। বিনামূল্যে Free Demo ক্লাস শুনতে চাইলে নাম অন্তর্ভুক্ত করে রাখতে পারেন।

🛴 ব্লগ হোমপেজ  ›  সম্পর্ক ও সংযুক্তি

সম্পর্ক ও সংযুক্তি

দুই শিশুর মধ্যে হিংসা ও মারামারি থামানোর উপায়

পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৭ মিনিট  ·   ·  © পার্থ প্রতিম রায়

ব্লক নিয়ে ঝগড়ার পর দুই ভাইবোনের মাঝখানে শান্তভাবে বসে কথা বলছেন মা

রাত আটটা। একজন চেঁচাচ্ছে, “ও আমার খেলনা নিয়েছে!” আরেকজন কাঁদছে, “আগে ও আমাকে মেরেছে!” আর আপনি রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে ভাবছেন, আজ কার পক্ষে রায় দেবেন।

চেনা লাগছে? একজনকে বকলে অন্যজন মুচকি হাসে। দুজনকেই বকলে দুজনেই ক্ষুব্ধ। আর সব মিটে গেলে আপনার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে থাকে: আমি কি কোথাও ভুল করছি?

প্রথমেই বলে রাখি, না। দুই বা তার বেশি শিশুর ঘরে ঝগড়া, হিংসা আর হাতাহাতি প্রায় সব বাড়ির গল্প। এটা আপনার সন্তান পালনের ব্যর্থতা নয়। বরং ভাইবোন একসঙ্গে বড় হওয়ার সময় ভাগ করে নেওয়া, হার মানা আর নিজের জায়গা বোঝার প্রথম পাঠশালা। চলুন দেখি, দুই শিশুর মধ্যে হিংসা ও মারামারি থামানোর উপায় কী।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ভাইবোনের হিংসা আর মারামারি থামাতে হলে আগে বুঝতে হবে, ঝগড়ার নিচে প্রায়ই থাকে মনোযোগ, ন্যায্যতা আর নিজের জায়গা হারানোর ভয়। তাই বিচারক না হয়ে মধ্যস্থতাকারী হোন, প্রত্যেক শিশুকে আলাদা সময় দিন, তুলনা বন্ধ করুন এবং মারামারির ক্ষেত্রে স্পষ্ট, শান্ত সীমারেখা ঠিক করুন।

ভাইবোনের মধ্যে হিংসা ও মারামারি কেন হয়?

সোজা কথা, একই ঘরে দুজন শিশু মানে দুজন আলাদা মানুষ, যারা একই দুজন মা-বাবার মনোযোগ ভাগ করে নিচ্ছে। শিশুর চোখে আপনি সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই সম্পদ ভাগ হলে কারও মনে হতেই পারে, আমার ভাগ কমে গেল।

তার ওপর দুজনের বয়স, মেজাজ আর চাহিদা আলাদা। এমন দুজন একই ঘর, একই খেলনা আর একই মা-বাবাকে ভাগ করলে ঠোকাঠুকি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: ঝগড়ার নিচে আসলে কী থাকে?

মনোযোগের প্রতিযোগিতা

ছোট শিশুর কাছে মনোযোগ মানেই ভালোবাসার প্রমাণ। তাই মা-বাবার কোলে, চোখে বা কথায় ভাগ বসলে সে সেটা ফিরে পেতে লড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বকুনিও এক ধরনের মনোযোগ। ফলে যে শিশুটি ভালো আচরণে নজর পায় না, সে অনেক সময় ঝগড়ার মধ্য দিয়েই আপনাকে কাছে টানে।

ন্যায্যতার বোধ

বাচ্চাদের মনে একটা ছোট্ট হিসাবরক্ষক থাকে। কে বেশি আইসক্রিম পেল, কার ভাগে বড় টুকরো, কাকে কম বকা হলো, সব তার খাতায় ওঠে। ফ্যাবার ও মাজলিশের বইয়ের একটি মূল ভাবনা হলো, শিশুরা সমান ভাগের চেয়ে নিজের জন্য আলাদা করে ভালোবাসা চায়। “তোমাদের দুজনকেই সমান ভালোবাসি” শুনে তাই তারা সবসময় শান্ত হয় না।

নিজের আলাদা পরিচয়ের খোঁজ

ভাইবোন একই পরিবেশে থাকলেও দুজন চায় আলাদা মানুষ হিসেবে চেনা হতে। একজন পড়াশোনায় ভালো, অন্যজন ছবি আঁকে, এই ভাগাভাগি শিশুরা নিজেরাই করে ফেলে। তখন একজনের প্রশংসা শুনলে অন্যজনের মনে হয়, ওই জায়গাটা আমার ছিল না, আমি তাহলে কী? এখান থেকেই জন্ম নেয় হিংসা। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইবোনের মধ্যে উষ্ণতা আর দ্বন্দ্ব একসঙ্গে থাকতে পারে, আর দ্বন্দ্ব মেটানোর দক্ষতা শেখানো সম্পর্কের জন্য কাজে লাগে (Kramer, 2010)।

বাবা-মায়ের কোন ভুলগুলো সমস্যাটি বাড়াতে পারে?

এই অংশটা পড়ে নিজেকে দোষ দেবেন না। নিচের প্রতিটা কাজ আমরা প্রায় সবাই কখনও না কখনও করে ফেলি, বিশেষ করে ক্লান্ত দিনে।

তুলনা। “দেখো, তোমার ভাই কত গুছিয়ে খায়!” বাক্যটা ভালো উদ্দেশ্যে বলা হলেও শিশু শোনে, আমি ওর চেয়ে কম। তুলনার ক্ষতি দুদিকেই যায়। যাকে ছোট করা হলো, তার মনে অভিমান জমে। আর যাকে প্রশংসা করা হলো, সে ভাইবোনকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শেখে।

সবসময় বড়কে দোষ দেওয়া। “তুমি তো বড়, একটু ছেড়ে দাও।” বড় সন্তান তখন ভাবে, বড় হওয়া মানেই শাস্তি। ছোটজন অনেক সময় বুঝে যায়, কাঁদলেই জেতা যায়।

তকমা দেওয়া। “ও তো ঝগড়াটে”, “ও হিংসুটে” ধরনের কথা শিশুর মনে বসে যেতে পারে। যে আচরণটা সমস্যা, তাকে নিয়ে কথা বলুন, শিশুকে নয়।

ভাইবোনের হিংসা ও মারামারি থামাতে কী করবেন?

জাদুমন্ত্র নেই, তবে তিনটি ধাপ আছে, যা ধৈর্য ধরে চালালে ঘরের হাওয়া বদলাতে শুরু করে।

১বিচারক নয়, মধ্যস্থতাকারী হোন

কী করবেন: ঝগড়া মেটাতে গিয়ে রায় দেবেন না। দুজনের কথাই আগে শুনুন।

কেন করবেন: রায় মানেই একজন জিতল, আরেকজন হারল। হারা শিশুর মনের ক্ষোভ পরের ঝগড়ায় ফিরে আসতে পারে।

কীভাবে করবেন: আগে দুজনকে একটু আলাদা করে দিন, সবাই শান্ত হলে একে একে বলতে দিন। এই মন দিয়ে শোনা অংশটাই আসল। আবেগটার নাম দিন: “তুমি রেগে গেছ, কারণ খেলার মাঝখানে ও ব্লকটা নিয়ে নিয়েছে।” গবেষক জন গটম্যান আবেগ চেনানোর ওপর জোর দিয়েছেন (Gottman, 1997)। তারপর জিজ্ঞেস করুন, “এখন কী করলে দুজনেই ঠিক থাকবে?” সমাধান শিশুদের মুখ থেকেই আসতে দিন।

২প্রত্যেকের জন্য আলাদা সময় রাখুন

কী করবেন: দিনে অন্তত দশ-পনেরো মিনিট একজনের সঙ্গে শুধু তার নিজের সময় কাটান। পালা করে।

কেন করবেন: মনোযোগের খিদে মিটলে প্রতিযোগিতার ঝাঁঝ কমতে পারে। শিশু বোঝে, ভাইবোন থাকলেও আমার জায়গা আমারই আছে।

কীভাবে করবেন: ফোন সরিয়ে রাখুন। শিশুকেই ঠিক করতে দিন কী খেলবেন বা কী গল্প করবেন। ঘুমের আগের ছোট্ট সময়ও চলে। সময়ের সংখ্যাটা বাঁধা নয়; কম সময় হলেও নিয়মিত হওয়াটাই আসল।

৩মারামারির জন্য স্পষ্ট ও শান্ত সীমারেখা

কী করবেন: রাগ আর হিংসা অনুভব করা দোষের নয়, কিন্তু মারা, কামড়ানো বা জিনিস ছুড়ে মারা চলবে না। এই সীমারেখা আগেই, শান্ত সময়ে ঠিক করে ফেলুন।

কেন করবেন: আবেগ বুঝতে পারা আর আচরণ সামলানো আলাদা দক্ষতা। ছোটদের ক্ষেত্রে সাধারণত আবেগ আগে জাগে, সামলানোর দক্ষতা গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে।

কীভাবে করবেন: পরিবারের দু-তিনটি নিয়ম ছোট বাক্যে ঠিক করুন, যেমন “হাত দিয়ে মারা চলবে না।” মারামারি শুরু হলে চেঁচিয়ে নয়, নিচু ও দৃঢ় গলায় বলুন, “থামো। এখন দুজন আলাদা জায়গায় একটু ঠান্ডা হও।” শাস্তির ভয় দেখানো নয়, শান্ত হওয়ার সুযোগ দিন। সবাই শান্ত হলে দুজনের কাছে গিয়ে ঘটনাটা নিয়ে কথা বলুন। আপনি নিজেও রেগে গেলে একটু সরে গিয়ে এক গ্লাস জল খেয়ে আসুন। আপনার শান্ত থাকার চেষ্টা ওদের কাছে একটা বড় উদাহরণ হয়ে থাকে।

মেয়ের সঙ্গে আলাদা করে ছবি আঁকছেন মা, প্রত্যেক সন্তানের জন্য নিজস্ব সময়
একটি বাস্তব উদাহরণ

রুমা, ঋতম ও মিষ্টির গল্প

রুমার দুই সন্তান: আট বছরের ঋতম আর পাঁচ বছরের মিষ্টি। প্রতি বিকেলে ব্লক নিয়ে ঝগড়া, তারপর চিৎকার, মাঝে মাঝে চুল টানাটানি। রুমা রোজ বলতেন, “তুমি বড়, ছেড়ে দাও।” ঋতম ক্রমশ চুপ আর বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল, আর মিষ্টি বুঝে গিয়েছিল, কাঁদলেই ব্লক হাতে আসে।

একদিন রুমা বিচার করা ছাড়লেন। ঋতমকে বললেন, “তুমি রেগে আছ কারণ নিজের টাওয়ারটা ভেঙে গেছে, তাই তো?” ঋতম প্রথমবার মাথা নেড়ে কেঁদে ফেলল। এরপর রুমা দিনে পনেরো মিনিট একজনের সঙ্গে শুধু তাঁর পছন্দের কাজ করতেন, পালা করে। ঋতমের সঙ্গে ক্রিকেটের গল্প, মিষ্টির সঙ্গে ছবি আঁকা। “হাত চলবে না” নিয়মটাও দেয়ালে টাঙিয়ে দিলেন। প্রথম সপ্তাহে ঝগড়া কমেনি। কিন্তু তিন-চার সপ্তাহ পরে ঋতম নিজেই একদিন বলল, “মা, এই টাওয়ারটা আমাদের দুজনের, মিষ্টিকে অর্ধেক দিই?” ঝগড়া পুরোপুরি যায়নি, তবে চিৎকার আর হাতাহাতি অনেক কমে এল।

(নাম কাল্পনিক। এটি একটি চিত্রিত উদাহরণ।)

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন?

বেশিরভাগ ঝগড়া স্বাভাবিক। তবে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে শিশু-মনোবিদ বা শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা ভালো:

  • মারামারিতে বারবার গুরুতর আঘাত লাগছে বা কেউ কাউকে ভয় পাচ্ছে।
  • একজন শিশু ক্রমাগত মনমরা, চুপচাপ বা স্কুলে যেতে চাইছে না।
  • ঘুম, খাওয়া বা পড়াশোনায় স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে।
  • কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত চেষ্টার পরও পরিস্থিতি একই থাকছে, বা আপনি নিজে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।

সাহায্য চাওয়া মানে হার মানা নয়, বরং সময়মতো সঠিক পথে হাঁটা।

FAQ

ভাইবোনের বয়সের ব্যবধান বেশি হলে কি ঝগড়া কম হয়?

সবসময় নয়। ব্যবধান বেশি হলে খেলার প্রতিযোগিতা কমতে পারে, কিন্তু অন্য ধরনের টানাপোড়েন আসে। বড়জন ভাবে ছোটজনকে বেশি আদর করা হচ্ছে, ছোটজন ভাবে বড়র সব সুবিধা তার নেই। এ বিষয়ে প্রমাণ একরকম নয়। তাই বয়স নয়, প্রত্যেক শিশুর আলাদা চাহিদার দিকে নজর দেওয়াই বেশি কাজের।

ঝগড়ার সময় কি হস্তক্ষেপ না করাই ভালো?

ছোটখাটো বাদানুবাদে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে দেখতে পারেন, ওরা নিজেরাই মিটিয়ে নেয় কি না। এতে সমস্যা মেটানোর অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কিন্তু গায়ে হাত তোলা, জোরে আঘাত বা কোনো শিশুকে ভয় পেতে দেখলে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে থামান। নিরাপত্তা সবসময় আগে, ন্যায়বিচার পরে।

একজন বারবার ঝগড়া শুরু করলে কী করব?

তাকে ঝগড়াটে ভেবে নেবেন না। অনেক সময় বারবার ঝগড়া শুরু করার পেছনে থাকে মনোযোগের অভাব বা কোনো অপূর্ণ চাহিদা। শান্ত সময়ে তার সঙ্গে আলাদা বসে জানতে চান, কোন মুহূর্তগুলোতে তার কষ্ট হয়। আলাদা সময় আর ছোট ভালো আচরণের স্বীকৃতি অনেকের ক্ষেত্রে সাহায্য করে।

ভাইবোনের হিংসা কি কখনও পুরোপুরি মিটে যায়?

পুরোপুরি মিটে যাবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কিছুটা প্রতিযোগিতা প্রায় সব ভাইবোনের মধ্যেই থাকে। তবে বয়স বাড়লে, আর ঘরে সুরক্ষিত ও ভালোবাসাভরা পরিবেশ থাকলে হিংসার ঝাঁঝ কমে আসতে পারে। লক্ষ্য হিংসা শূন্য করা নয়, ওরা যেন তা সামলাতে শেখে।

শেষ কথা

ভাইবোনের ঝগড়া মানে এই নয় যে ওদের মধ্যে ভালোবাসা নেই। বরং ঝগড়ার মধ্য দিয়েই ওরা শিখছে, কীভাবে আপস করতে হয়, কীভাবে নিজের কথা বলতে হয়। আপনার কাজ ঝগড়া পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, ওদের সেই দক্ষতা শেখার পথে পাশে থাকা। আজই শুধু একটি জিনিস করে দেখুন: আজ রাতে একজনের সঙ্গে পনেরো মিনিট আলাদা সময় কাটান। কাল অন্যজনের সঙ্গে।

আরও পড়তে পারেন

Research & References

  • Faber, A., & Mazlish, E. (1987). Siblings Without Rivalry: How to Help Your Children Live Together So You Can Live Too. W. W. Norton & Company.
  • Kramer, L. (2010). The essential ingredients of successful sibling relationships: An emerging framework for advancing theory and practice. Child Development Perspectives, 4(2).
  • Gottman, J., with DeClaire, J. (1997). Raising an Emotionally Intelligent Child: The Heart of Parenting. Simon & Schuster.

  ব্লগের সব লেখায় ফিরে যান