আমাদের Child Psychology কোর্স আছে। বিনামূল্যে Free Demo ক্লাস শুনতে চাইলে নাম অন্তর্ভুক্ত করে রাখতে পারেন।

🛴 ব্লগ হোমপেজ

অভিভাবকত্ব ও Parenting Tips

শিশুর জেদ কমাতে চান? আগে বুঝুন, ও আপনাকে জ্বালাচ্ছে না, নিজেই ভেতরে জ্বলছে

পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট  ·  © পার্থ প্রতিম রায়

মা হাঁটু গেড়ে বসে অভিমানী ছেলের সাথে চোখের সমান উচ্চতায় শান্তভাবে কথা বলছেন

আপনার সন্তান কি বাজারে চকোলেট না পেলে মেঝেতে শুয়ে পড়ে? আর আশেপাশের সবাই এমনভাবে তাকায়, যেন আপনি কোনো বড় অপরাধ করে ফেলেছেন? ওই মুহূর্তে মনে হয় মাটি ফাঁক হলে ঢুকে যেতে পারলে ভালো হতো। আর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘোরে: ছেলেটা বা মেয়েটা এত জেদি কেন?

বেশিরভাগ বাবা-মা এর উত্তর জানেন একটাই: বেশি আদর দিয়েছি, তাই মাথায় উঠেছে। তারপর কেউ বকেন, কেউ ভয় দেখান, কেউ হাল ছেড়ে চকোলেটটাই কিনে দেন। পরের দিন আবার সেই একই নাটক। এতে আপনার দোষ নেই। জেদের সময় শিশুর ভেতরে আসলে কী চলছে, সেটা কেউ আপনাকে শেখায়নি। এই একটা কথা বুঝলে লড়াইয়ের অর্ধেকটা এমনিই সহজ হয়ে যায়।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

শিশুর জেদ কোনো বাড়াবাড়ি বা অবাধ্যতা নয়। এটা আবেগ সামলাতে না পারার লক্ষণ। ওই সময় তার মস্তিষ্কের যুক্তি আর নিয়ন্ত্রণের অংশ ঠিকমতো কাজ করে না। তাই আগে আবেগ শান্ত করুন, তারপর নিয়ম বোঝান। বকুনির চেয়ে শান্ত উপস্থিতি আর স্পষ্ট সীমা অনেক বেশি কাজে লাগে।

সমস্যাটি কেন হয়?

শিশুর মনে বড়দের মতোই রাগ, হতাশা আর অভিমান আছে। কিন্তু সেগুলো সামলানোর যন্ত্রপাতি তার এখনও তৈরি হয়নি। ভাবুন তো, আপনাকে হঠাৎ এক বিশাল অফিসের প্রধান বানিয়ে দেওয়া হলো, অথচ হাতে একজন সহকারীও নেই। প্রথম ধাক্কাতেই সব এলোমেলো হবে। শিশুরও ঠিক তাই হয়।

ছোট বয়সে শব্দও কম থাকে। আমার খুব খারাপ লাগছে, কারণ আমি আরও খেলতে চেয়েছিলাম, এই কথাটা বলার মতো ভাষা তার কাছে নেই। তাই সে চিৎকার করে, মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। ওটাই তার ভাষা। আবার দুই থেকে চার বছর বয়সে শিশু নিজে করতে চায়, নিজে বেছে নিতে চায়। ইচ্ছা অনেক, ক্ষমতা কম। এই ফাঁকটাই জেদের সবচেয়ে বড় জায়গা।

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

কারণ ১ — মস্তিষ্কের ম্যানেজার এখনও তৈরি হচ্ছে

মস্তিষ্কের সামনের অংশ যুক্তি, ধৈর্য আর নিজেকে সামলানোর কাজ করে। এই অংশ গড়ে উঠতে অনেক বছর লাগে, কারও কারও ক্ষেত্রে কুড়ির কোঠা পর্যন্ত। অথচ আবেগের অংশ অনেক আগেই সক্রিয়। ড্যানিয়েল সিগেল ও টিনা পেইন ব্রাইসন তাঁদের The Whole-Brain Child বইয়ে এটাকে সহজ উপমায় বুঝিয়েছেন: রাগের সময় মস্তিষ্কের ঢাকনা খুলে যায়। তখন যুক্তি কাজ করে না। ওই সময় লেকচার দেওয়া মানে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা ছাড়া হিসাবের খাতা খুলে বসা।

কারণ ২ — জেদেরও একটা ছন্দ আছে

কিছু গবেষণায় (Potegal ও সহকর্মীরা, ২০০৩) দেখা গেছে, ছোটদের জেদের ঝড়ে প্রথমে থাকে রাগ, চিৎকার আর ছোড়াছুড়ি। তারপর ধীরে ধীরে সেটা কান্না আর কষ্টের দিকে গড়ায়। মানে শেষ দিকে শিশুটি আসলে সান্ত্বনা খোঁজে। তাই ঝড়ের চূড়ায় থামানোর চেষ্টার বদলে ঝড়টা কমতে দেওয়া, আর শেষের দিকে পাশে থাকাই বেশি অর্থবহ।

কারণ ৩ — ফল পেলে আচরণ অভ্যাস হয়ে যায়

কেঁদে চিৎকার করলে যদি চকোলেট মেলে, শিশু শেখে এই পথে কাজ হয়। এটা আচরণ বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম: যে আচরণে লাভ হয়, সেটা বারবার ফিরে আসে। তাই সমবেদনা আর হার মানা এক জিনিস নয়। শিশুর আবেগ আপনি মেনে নিতে পারেন, কিন্তু তার দাবি না-ও মানতে পারেন।

বাবা-মায়ের কোন ভুলগুলো সমস্যাটি বাড়াতে পারে?

সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো ভয় দেখানো, যেমন পুলিশ ডাকব বা ফেলে চলে যাব। এতে শিশুর আবেগ কমে না, শুধু নিরাপত্তার বোধ কমে। দ্বিতীয় ভুল হলো আবেগ উড়িয়ে দেওয়া: এত কান্নার কী আছে? শিশু তখন বোঝে তার অনুভূতির দাম নেই, আর আরও জোরে চিৎকার করে। তৃতীয়ত, কখনও কড়া হওয়া আবার কখনও হার মানা। শিশু তখন ধরে নেয়, চিৎকারটা আরেকটু চালিয়ে গেলে হয়তো কাজ হবে।

কী করবেন?

১আগে নিজে শান্ত হন

কী করবেন: নিজের শ্বাস ধীর করুন, গলা নামিয়ে কথা বলুন।
কেন:
শিশু নিজেকে শান্ত করতে শেখে বড়দের শান্ত ভাব দেখে।
কীভাবে:
হাঁটু গেড়ে তার চোখের সমান উচ্চতায় বসুন।
ভুল এড়ান:
চিৎকারের জবাবে চিৎকার।

২দাবি নয়, আবেগটার নাম দিন

কী করবেন: বলুন, তুমি খুব রেগে গেছ, কারণ আরও খেলতে চেয়েছিলে।
কেন:
আবেগের নাম দিতে পারলে সেটা কমে আসে, সিগেল একে বলেন নাম দিয়ে শান্ত করা। ফেবার ও মাজলিশও একই কথা বলেন: আগে অনুভূতি স্বীকার করুন।
কীভাবে:
ছোট বাক্য, নরম সুর।
ভুল এড়ান:
কিন্তু দিয়ে শুরু করা বা ব্যাখ্যা জুড়ে দেওয়া।

৩সীমা রাখুন, কিন্তু নরমভাবে

কী করবেন: বলুন, আজ চকোলেট কেনা হবে না। তবে কাঁদতে চাইলে কাঁদতে পারো, আমি এখানেই আছি।
কেন:
স্পষ্ট ও একই রকম সীমা শিশুকে নিরাপদ বোধ করায়।
কীভাবে:
একটা বাক্যে বলুন, বারবার একই কথা বলুন।
ভুল এড়ান:
দশ মিনিট পর হার মানা।

৪আগে থেকে ছোট ছোট পছন্দ দিন

কী করবেন: লাল জামা না নীল জামা, এই ধরনের বেছে নেওয়ার সুযোগ দিন।
কেন:
নিজের ইচ্ছার জায়গা পেলে জেদের দরকার কমে। রস গ্রিন তাঁর The Explosive Child বইয়ে বলেন, শিশুরা পারলে ঠিকঠাকই আচরণ করে, অর্থাৎ সমস্যা প্রায়ই দক্ষতার, ইচ্ছার নয়।
কীভাবে:
দিনে অন্তত দু-তিনটে জায়গায় সুযোগ দিন।

বাজারে মা ছেলের সামনে বসে শান্তভাবে বোঝাচ্ছেন
একটি বাস্তব উদাহরণ

চার বছরের ঋত্বিক বাজারে চকোলেটের সামনে থেমে গেল। মা না বলতেই সে মেঝেতে শুয়ে চিৎকার শুরু করল। প্রথমে মা ধমক দিলেন, তারপর ভয় দেখালেন। ঋত্বিক আরও জোরে কাঁদল। শেষে হার মেনে চকোলেট কিনে দিলেন। পরের সপ্তাহে একই দৃশ্য, আরও বড় আকারে।

এরপর মা পদ্ধতি বদলালেন। ঋত্বিকের পাশে বসে নিচু গলায় বললেন, চকোলেটটা খুব চাইছিলে, না পেয়ে রাগ হচ্ছে, তাই তো? আজ কেনা হবে না। আমি তোমার পাশেই আছি। প্রথমবার ঋত্বিক কিছুক্ষণ কেঁদেছিল। কিন্তু মা শান্ত ছিলেন। কান্না কমলে মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আজ ফল কিনবে, নাকি বিস্কুট? কয়েক সপ্তাহে ঝড়ের সময় ছোট হয়ে এল। সব বদলায়নি, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক সহজ হলো।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন?

পাঁচ-ছয় বছরের পরও যদি জেদ দিনে অনেকবার হয় আর অনেকক্ষণ ধরে চলে, শিশু নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করে, রাগের সময় দম আটকে ফেলে, অথবা ঘুম, খাওয়া ও স্কুলে এর প্রভাব পড়ে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা Child Psychologist-এর সঙ্গে কথা বলা বিবেচনা করতে পারেন।

FAQ

শিশু জেদ করলে কি বকা উচিত?

জেদের মুহূর্তে বকলে সাধারণত ঝড় বাড়ে, কারণ শিশু তখন যুক্তি শোনার অবস্থায় থাকে না। আগে তাকে শান্ত হতে দিন, তারপর কী ঠিক হয়নি সেটা ছোট বাক্যে বলুন। সীমা কড়া হতে পারে, কিন্তু সুর নরম রাখলে শিশু বেশি শেখে।

জেদ করলে দাবি মেনে নিলে কী হয়?

মেনে নিলে শিশু শেখে জেদ করলে কাজ হয়, ফলে পরের বার আরও বেশি করে। তবে ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দেওয়া দোষের নয়, যদি আপনি ভেবেচিন্তে দেন, চাপে পড়ে নয়। আসল কথা হলো একই নিয়মে থাকা।

কোন বয়সে জেদ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়?

সাধারণত দেড় থেকে চার বছরের মধ্যে জেদ বেশি দেখা যায়, কারণ তখন শিশুর নিজে করার ইচ্ছা বাড়ে কিন্তু ভাষা আর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে। বয়স বাড়লে বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে এটা ধীরে ধীরে কমে আসে।

জেদের সময় কোলে নেওয়া কি ঠিক?

শিশু যদি কোল চায়, বা ঝড়ের শেষ দিকে কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন কোলে নেওয়া তাকে শান্ত হতে সাহায্য করে। তবে সে যদি ছোড়াছুড়ি করে বা ছুঁতে না দেয়, জোর করবেন না। পাশে বসে থাকাই যথেষ্ট।

শেষ কথা

শিশুর জেদ কমানোর আগে একটা কথা মনে রাখুন: ও আপনাকে জ্বালাতে চাইছে না, নিজেই ভেতরে জ্বলছে। আগে আবেগকে জায়গা দিন, তারপর নিয়মের কথা বলুন। একদিনে সব বদলাবে না। কিন্তু প্রতিদিনের শান্ত, ধারাবাহিক চেষ্টা শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ সামলাতে শেখায়।

আরও পড়তে পারেন

Research & References

  • Siegel, D. J. ও Bryson, T. P. (২০১১). The Whole-Brain Child. Delacorte Press.
  • Greene, R. W. The Explosive Child. HarperCollins (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৮).
  • Faber, A. ও Mazlish, E. (১৯৮০). How to Talk So Kids Will Listen & Listen So Kids Will Talk.
  • Potegal, M., Kosorok, M. R. ও Davidson, R. J. (২০০৩). Temper tantrums in young children. Journal of Developmental & Behavioral Pediatrics.
  • Skinner, B. F. (১৯৫৩). Science and Human Behavior. (আচরণ ও ফলের সম্পর্ক)

নোট: এগুলো প্রতিষ্ঠিত বই ও গবেষণা। প্রকাশের আগে সংস্করণ, বছর ও প্রকাশনার নাম একবার মিলিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

  ব্লগের সব লেখায় ফিরে যান