আমাদের Child Psychology কোর্স আছে। বিনামূল্যে Free Demo ক্লাস শুনতে চাইলে নাম অন্তর্ভুক্ত করে রাখতে পারেন।

🛴 ব্লগ হোমপেজ  ›  বিকাশ ও মনোজগৎ

বিকাশ ও মনোজগৎ

শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও একাগ্রতা বাড়াতে প্রতিদিনের ৫টি ঘরোয়া চর্চা

পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৬ মিনিট  ·   ·  © পার্থ প্রতিম রায়

ভারতীয় পরিবারের ঘরে মা ও ছোট শিশু মেঝেতে বসে স্মৃতির খেলা খেলছে, শিশুর একাগ্রতা বাড়ানোর ঘরোয়া চর্চা

"খাতাটা বের করো," বললেন আপনি। দুই মিনিট পরে দেখলেন, খাতা বেরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সন্তান তখন পেনসিলের ডগা নিয়ে গভীর গবেষণায় ব্যস্ত।

চেনা দৃশ্য, তাই না? কাজ শুরু হয়, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে মন চলে যায় জানালার বাইরে, পাখির দিকে, নয়তো পাশের ঘরের শব্দে। আপনি ভাবতে থাকেন, "ও কি পারবে না? আমি কি কিছু ভুল করছি?"

প্রথমেই বলে রাখি, এটা আপনার দোষ নয়, সন্তানেরও নয়। মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ভালো খবর হলো, শিশুর একাগ্রতা বাড়ানোর উপায় খুঁজতে দামি খেলনা বা আলাদা কোর্স লাগে না। রান্নাঘর, বারান্দা আর রাতের গল্পের সময়ই যথেষ্ট।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

শিশুর মনোযোগ আর চিন্তার দক্ষতা গড়ে ওঠে রোজকার ছোট ছোট অভ্যাসে। গল্প বলা, স্মৃতির খেলা, ছোট দায়িত্ব, শরীর নাড়ানো খেলা আর কয়েক মিনিটের শান্ত সময় দিয়ে শুরু করুন। জোর নয়, আনন্দই এখানে চাবি। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খেলা ও নড়াচড়াভিত্তিক চর্চা এই দক্ষতায় সাহায্য করতে পারে।

শিশুর মন কেন এক জায়গায় থাকতে চায় না?

মস্তিষ্কের যে অংশ মনোযোগ ঠিক রাখে, মাথায় তথ্য ধরে রাখে আর আবেগ সামলায়, সেটি ছোটবেলায় সবে তৈরি হচ্ছে। হার্ভার্ডের Center on the Developing Child এই দক্ষতাগুলোকে "এক্সিকিউটিভ ফাংশন" বলে। তারা একে তুলনা করেছে বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে, যা অনেক বছর ধরে ধীরে গড়ে ওঠে। তিন-চার বছরের শিশুর কাছে বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকা চাওয়া মানে তাকে ম্যারাথনে নামিয়ে দেওয়া।

তাই সন্তান যখন খাতা ফেলে জানালার দিকে তাকায়, সে আপনাকে অবহেলা করছে না। চারপাশের হাজারটা জিনিসের মধ্য থেকে একটায় মন রাখা কীভাবে শিখতে হয়, তার মস্তিষ্ক এখনও সেটাই শিখছে।

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: তিনটি মূল কারণ

মস্তিষ্কের "ব্রেক" এখনও তৈরি হচ্ছে

শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ চলছে। তাই আকর্ষণীয় কিছু দেখলে থেমে যাওয়া বা নিজেকে সামলে নেওয়া তার কাছে কঠিন। এটা অবাধ্যতা নয়, বিকাশের একটা ধাপ।

শিশু শেখে নড়েচড়ে

ছোটদের কাছে খেলাই শেখার ভাষা। বসে শোনার চেয়ে ছুঁয়ে, নেড়ে, করে দেখলে তার মন বেশি জেগে থাকে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সের একটি রিপোর্টেও খেলাকে শিশুর বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে।

ক্লান্তি, ঘুম আর পরিবেশ

ঘুম কম হলে বা চারপাশে টিভি, ফোন আর কথাবার্তা একসঙ্গে চললে মনোযোগ সহজেই ছড়িয়ে যায়। বড়দেরও যায়, শিশুদের তো আরও।

বাবা-মায়ের কোন অভ্যাসগুলো সমস্যাটা বাড়াতে পারে?

ভালোবেসেই আমরা কিছু কাজ করি, যা উল্টো ফল দেয়। বারবার "মন দাও, মন দাও" বললে চাপ বাড়ে, মনোযোগ নয়। একসঙ্গে অনেক নির্দেশ ("জুতো পরো, ব্যাগ নাও, জল খাও") দিলে ছোট্ট মাথায় জট পাকায়। "ওই দেখো, ও কেমন চুপ করে বসে আছে" ধরনের তুলনা আত্মবিশ্বাস কমায়। আর খাওয়ার সময় ফোন বা কার্টুন চালিয়ে রাখলে মন এমনিতেই টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এসব আমরা সবাই কখনও না কখনও করেছি। লক্ষ করাই প্রথম ধাপ।

আরেকটা ভুল হলো ফল দেখার তাড়া। আজ শুরু করে কালই "কই, বদলাল না তো" মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু মনোযোগ গড়ে উঠতে সময় লাগে। অভ্যাস তৈরি হয় সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে, এক রাতে নয়।

শিশুর মনোযোগ বাড়াতে কী করবেন? ৫টি ঘরোয়া চর্চা

পাঁচটা একসঙ্গে শুরু করার দরকার নেই। একটা বেছে নিন, এক সপ্তাহ চালান, তারপর দেখুন কেমন লাগছে।

১রাতে "অর্ধেক গল্প"

কী করবেন: গল্প বলতে বলতে মাঝপথে থেমে যান।

কেন: শুনে মনে রাখা আর কল্পনা করা, দুটোই ভাষা ও স্মৃতিকে খাটায়।

কীভাবে: জিজ্ঞেস করুন, "তারপর কী হলো বলো তো?" শেষটা সন্তানকেই বানাতে দিন। উদ্ভট শেষ হলেও হাসুন। পাঁচ-দশ মিনিটই যথেষ্ট।

২"কী বদলাল?" খেলা

কী করবেন: টেবিলে তিন-চারটে জিনিস রাখুন। সন্তান চোখ বুজলে একটা সরিয়ে নিন।

কেন: খেয়াল করা আর মনে রাখার এটা ছোট্ট ব্যায়াম, শিশুর স্মৃতিশক্তির জন্য ভালো।

কীভাবে: জিনিসের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ান। কয়েক দিন পর ভূমিকা বদলে নিন, সন্তান আপনাকে ধাঁধা দিক। আপনি হারলে নাটক করে দুঃখ পান, ওর মজা দ্বিগুণ হবে।

৩রান্নাঘরে ছোট দায়িত্ব

কী করবেন: সবজি ধোয়া, রুটির ময়দা মাখা বা টেবিল সাজানোর মতো নিরাপদ কাজ দিন। ছুরি-আগুন নয়।

কেন: ধাপ মনে রেখে একটার পর একটা করার অভ্যাস তৈরি হয়।

কীভাবে: একবারে দুটো ধাপই বলুন: "আগে জলে ধোও, তারপর ঝুড়িতে রাখো।" ভুল শোধরানোর আগে ধন্যবাদ জানান।

৪রোজ কিছুক্ষণ দৌড়ঝাঁপের খেলা

কী করবেন: বারান্দা, ছাদ বা পার্কে শরীর নাড়ানোর সুযোগ দিন।

কেন: Diamond ও Lee-র একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু শারীরিক ও খেলাভিত্তিক কার্যক্রম এসব দক্ষতায় সাহায্য করতে পারে। তবে সব কার্যক্রমের ফল এক নয়, প্রমাণও সব ক্ষেত্রে সমান শক্ত নয়।

কীভাবে: "স্ট্যাচু" বা "লাল বাতি, সবুজ বাতি" খেলুন। থামার অভ্যাসটা খেলার ছলেই তৈরি হয়।

৫দিনের শেষে পাঁচ মিনিটের শান্ত সময়

কী করবেন: ফোন-টিভি বন্ধ করে একসঙ্গে বসুন।

কেন: শান্ত থাকার অভ্যাস আবেগ সামলানো ও মনোযোগের কাজে লাগতে পারে। এ নিয়ে শিশুদের ওপর গবেষণা এখনও বাড়ছে, তাই বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না।

কীভাবে: "বেলুন শ্বাস" করুন: নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে পেট ফোলান, আস্তে ছাড়ুন। আপনিও করুন। আপনার শান্ত মুখটাই ওর সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।

রান্নাঘরে মায়ের সঙ্গে সবজি ধুচ্ছে ছোট মেয়ে, খেলার মাধ্যমে শেখা ও ছোট দায়িত্বের অভ্যাস
একটি বাস্তব উদাহরণ

(নিচের নাম ও পরিবার কাল্পনিক।)

ছয় বছরের রিয়া হোমওয়ার্কে বসলেই মিনিট পাঁচেকের মধ্যে উঠে পড়ত। মা সুমিতা প্রথম প্রথম বকতেন, তারপর নিজেই খারাপ লাগায় চুপ করে যেতেন। একদিন তিনি ঠিক করলেন, পড়ার আগে নয়, আগে খেলা। মনে প্রশ্ন ছিল, এত সামান্য খেলায় আদৌ কিছু হবে কি না। তবু তিনি দশ মিনিটের বেশি সময় রাখলেন না, যাতে রিয়ার মজা ফুরিয়ে না যায়। সপ্তাহখানেক রোজ সন্ধ্যায় দুটো জিনিস চালালেন: "কী বদলাল?" আর রাতের অর্ধেক গল্প।

প্রথম কয়েক দিন রিয়া শুধু হেসেছে আর অদ্ভুত শেষ বানিয়েছে। দু-তিন সপ্তাহ পরে সুমিতা লক্ষ করলেন, গল্পের মাঝে ও আগের চেয়ে বেশি সময় ধরে বসে থাকছে, আর খেলায় জিনিসগুলো মনে রাখছে। পড়ার সময় হঠাৎ জাদু হয়নি। তবে বকাবকি কমেছে, আর রিয়া নিজেই বলে, "মা, আরেকটা খেলি?"

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা বিকাশের স্বাভাবিক পথ। তবে স্কুল থেকে বারবার একই অভিযোগ এলে, শিশু শুনছে বলে মনে না হলে, কথা বা খেলায় বয়সের তুলনায় পিছিয়ে আছে মনে হলে, কিংবা হঠাৎ আচরণ বদলে গেলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা চাইল্ড সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। এটা দুর্বলতা নয়, সন্তানের পাশে থাকার আরেকটা উপায়। কারণ খুঁজে বের করা তাঁদের কাজ, আপনার নয়।

FAQ

শিশু কতক্ষণ একটানা মন দিতে পারে?

সব শিশু আলাদা, তাই কোনো বাঁধা নিয়ম নেই। তিন-চার বছরের শিশুর জন্য কয়েক মিনিটই স্বাভাবিক। বয়স বাড়লে সময়ও ধীরে ধীরে বাড়ে। সময় মাপার চেয়ে দেখুন কাজটা সে আনন্দ নিয়ে করছে কি না। ছোট ছোট সফল অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে সময় বাড়ায়।

এসব চর্চায় কি আইকিউ বাড়ে?

আইকিউ বাড়বে, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। যা বলা যায়, গল্প, খেলা আর ছোট দায়িত্ব শিশুর মনোযোগ, স্মৃতি আর ধাপ মেনে কাজ করার অভ্যাসে সাহায্য করতে পারে। বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর উপায় বলতে আসলে এই দক্ষতাগুলোকেই বোঝানো হয়। ফলাফলের তাড়া না রেখে আনন্দে করুন।

screen time কি একেবারে বন্ধ করতে হবে?

একেবারে বন্ধ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়, দরকারও নেই। চেষ্টা করুন খাওয়ার সময় ও ঘুমের আগে screen এড়াতে, আর সম্ভব হলে সন্তানের সঙ্গে বসে দেখতে। তাহলে সেটা একা ডুবে থাকা নয়, গল্পের সুযোগও হয়ে যায়। ধীরে ধীরে বদলান, হঠাৎ নিয়ম চাপিয়ে নয়।

সন্তান আগ্রহ না দেখালে কী করবেন?

জোর করবেন না। আগে আপনি খেলাটা শুরু করুন, সন্তান পাশে এসে বসবে। সময় ছোট রাখুন, তিন-চার মিনিটেই থেমে যান। আজ না হলে কাল। খেলা শেষ করে দেওয়া, ওর আগ্রহ থাকতে থাকতেই, পরের দিনের আগ্রহ ধরে রাখার ভালো কৌশল।

শেষ কথা

সন্তানের মন এক জায়গায় না থাকলে ধরে নেবেন না যে কিছু ভেঙে গেছে। মনোযোগ একটা পেশির মতো, রোজ একটু একটু করে শক্ত হয়। আপনার দামি জিনিস লাগবে না, লাগবে সামান্য সময় আর অনেকটা ধৈর্য। আজ রাতে শুধু একটা গল্পের অর্ধেকটা বলে থেমে যান, তারপর দেখুন সন্তান কী বানায়। আপনি যথেষ্ট ভালো করছেন।

আরও পড়তে পারেন

Research & References

  • Center on the Developing Child at Harvard University. (2011). Building the Brain's "Air Traffic Control" System: How Early Experiences Shape the Development of Executive Function. Working Paper No. 11.
  • Diamond, A., & Lee, K. (2011). Interventions shown to aid executive function development in children 4 to 12 years old. Science, 333(6045), 959–964.
  • Yogman, M., Garner, A., Hutchinson, J., Hirsh-Pasek, K., & Golinkoff, R. M. (2018). The Power of Play: A Pediatric Role in Enhancing Development in Young Children. Pediatrics, 142(3), e20182058. (American Academy of Pediatrics)

নোট: এই তথ্যগুলো সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা ও নির্দেশিকার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। প্রকাশের আগে সর্বশেষ সংস্করণ যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

  ব্লগের সব লেখায় ফিরে যান